লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন হলো। এখন পড়াতেই বেশি মনোযোগ। যতই পড়ি ততই মনে হয় আরও বেশি পড়া বাকি। কি সব ছাইপাঁশ লিখে এতদিন মূল্যবান সময় নষ্ট করেছি। পড়তে যেয়ে কিছু কিছু বই হৃদয়ে অনুরণন তুলে, মগজে ঝাকি দেয়। কথাসাহিত্যিক মোশাহিদা সুলতানা ঋতুর ‘বড়ো শহরের ছোট গল্প’ ঠিক তেমনই একটা বই।
বইটার ফ্ল্যাপের লেখা আছে – ‘সমাজের মাপে যে মানুষেরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তাদের জন্ম, জীবন, সংগ্রাম ও মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে শহর বড়ো হতে থাকে অবিরাম। মাটির গভীরের শিলাস্তরের অজানা বিন্যাসের মতই শহরবাসীর জীবন অজানা-অদৃশ্য-অস্পষ্ট স্তরে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন এই পুরো শহরটা চেপে বসে আছে মানুষের সিনার ওপর, চাপটা সরিয়ে নিলেই উগরে বেড়িয়ে আসবে নিজ নিজ রূপে।’
‘স্তরগুলোর উন্মোচন শুরু হলে একেকটা জগদ্দল পাথর কেঁপে ওঠে, প্রবাহিত হয় জীবন, আর শুরু হয় একেকটি গল্প। হঠাৎ চাকরি হারানো কর্পোরেট একজিকিউটিভ, বেতন-না-পাওয়া শিক্ষক, ব্র্যান্ড-প্রেমী ব্যবসায়ী কন্যা, ভালবাসার কাঙাল জুতাশ্রমিক, গন্তব্যহীন বহুগামী মানুষ, নৈকট্যহীন নারী-পুরুষ, জীবনসঙ্গীর খোঁজে উচ্চশিক্ষিত মানুষ, পরিচয় সংকটে থাকা কৃষক সন্তান, সন্তানের আকাঙ্খায় গৃহবধূ।’
‘‘কোথাও-না-থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ী, বিদেশি-বিনিয়োগ নির্ভর মৌসুমি ব্যবসায়ী, অভিযান-পিপাসু যুবক, ক্ষুদ্র ঋণে জর্জরিত মা, আশ্রয়হীন পাগল, কিংবা তলায় থাকা গৃহকর্মী, ড্রাইভার, গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক – এসব গল্পে নড়েচড়ে ওঠে, জানান দেয় তাদের অস্তিত্ব, তারপর অনড় পাহারের মতো মানুষের হৃদয়ে ঘাপটি মেরে থাকে একেকটি গল্প হয়ে। ‘বড়ো শহরের ছোট গল্প’ বইটি এই সময়কে ধারন করে এমন পনেরটি ছোট গল্পের একটি সংকলন। সরল স্বঃতস্ফূর্ত বর্ণনায় লেখা গল্পগুলো এগিয়ে যায় সাবলীল গতিতে আর দাঁড় করায় অব্যক্ত অনুভূতির মুখোমুখি।’’
বইটার সংক্ষিপ্ত সারমর্ম এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আমি তাই শুধু বইটা পড়ে আমার যে অনুভূতি হয়েছে সেদিকেই আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো আমি কোনো সাহিত্য বোদ্ধা নই। একজন সাধারণ পাঠকমাত্র।
এই বইয়ে গল্প আছে পনেরটি। গল্পগুলো পড়ার পর মনে হয়েছে এগুলো নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে এক একটা উপন্যাস লেখা সম্ভব কিন্তু লেখক সেদিকে না যেয়ে গল্পের বিষয়বস্তুকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ফেনিয়ে গল্পের পরিধি না বাড়িয়ে মেদহীন ভাষায় গল্পগুলো লিখেছেন। যাতে করে পাঠক সহজেই গল্পের বিষয়বস্তুর সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারে।
আমি এক একটা গল্প পড়ার সময়ে টের পাচ্ছিলাম গল্পের চরিত্রগুলো আমার আশপাশে চলাফেরা করছে। এটা একটা অদ্ভুত অনুভূতি। প্রত্যেকটা গল্প শেষ করে আমি বেশ কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়বস্তুকে আত্মীকরণ করেছি। তারপর আবার নতুন একটা গল্প পড়া শুরু করেছি।
আমি নিশ্চিৎভাবেই বলতে পারি লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে গল্পগুলো লেখা। তাই চরিত্রগুলো বাস্তব হয়ে আমার কাছে ধরা দিচ্ছিলো। লেখক খুব কমই কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন বলে আমার ধারণা। বইটিকে শহরের প্রান্তিক মানুষের গল্প নামেও নামকরণ করা যেতে পারে। গল্পগুলোর নামকরণও খুবই সাদামাটা।
বইয়ের গল্পগুলো যথাক্রমে – অপরিচিত কোনো মানুষের সাথে কথা বলতে চাই, বেসরকারি, স্বপ্ন সংক্রমণ, অ্যালোপেসিয়া আরেয়াটা, শিক্ষকের বৌ, উচ্চবংশের লোক, আইলাইনার, পাগলের বৌ, ঝরাপাতার বন্ধন, প্রডিউসারের জন্মদিন, সাদা লঞ্চ, রানীপছন্দ, প্রাণীবিদের জীবনবোধ, পাখির গু, পারুল আপা।
বাংলাদেশে এখন ম্যাজিকরিয়ালিজম (জাদুবাস্তবতা) আর সুররিয়ালিজম (পরাবাস্তবতা) নিয়ে বিশাল আকারে মাতামাতি শুরু হয়েছে। এখন আমাদের সবকিছুকেই এদের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে। কিন্তু আমি একটা বিষয় বুঝি। আমাদের গল্পগুলো বলতে হবে আমাদের ভাষায়, আমাদের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। আমার চরিত্রগুলোকে নির্মাণ করতে হবে আমাদের সামাজিক পেক্ষাপটে।
তাদের শক্তি এবং অসহায়ত্বের জায়গাটাও নির্মাণ করতে হবে আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে। ম্যাজিকরিয়ালিজম আর সুররিয়ালিজম দিয়ে তাদের অসহায়ত্বকে কোনোভাবেই অতিক্রম করা যাবে না। সেগুলোকে অতিক্রম করতে হলে বুঝতে হবে আমাদের ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানকে। বুঝতে হবে আমাদের প্রশাসনিক এবং সামাজিক কাঠামোকে।
আমাদের কাঠামোর মধ্যে থেকে কোনটা সম্ভব আর কোনটা অসম্ভব সেটা আমরা সবাই জানি। এই বইয়ের গল্পের চরিত্রগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চেনা এবং জানা। কিন্তু আমরা উন্নয়ন বা আলগা ঠাট দেখাতে যেয়ে প্রতিনিয়ত তাদেরকে অবজ্ঞা করে চলি।
আমি আলাদাভাবে গল্পগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা না করে সেটাকে পাঠকের চমকের জন্যই রেখে দিচ্ছি। সবগুলো গল্পই আপনাকে ভাবাবে। তবে কিছু কিছু গল্পের মধ্যে যেন নিজেকেই আবিষ্কার করেছি এবং চমকিত হয়েছি। আমার জীবন প্রণালী যেহেতু প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে শহরের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত তাই বোধহয় বিষয়বস্তুগুলো আমাকে বেশি তাড়িত করেছে।
এখানে আরেকটা বিষয় উল্লেখ্য সেটা হচ্ছে শহরের এইসব মানুষদের সাথে আমাদের প্রতিদিন দেখা হয় কথা হয় কিন্তু আমরা কেউই তাদের গল্পগুলো জানার চেষ্টা করি না। কারণ আমাদের নিজেদের ফেইক জীবনে (ফেসবুক জীবনে) আমরা অলীক সব সমস্যা তৈরি করে রেখেছি। আর সেগুলো সমাধানের জন্য রয়েছে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পীর (মোটিভেশনাল স্পিকার) আমাদের সমস্যা যেমন অলীক পীরদের সমাধানও তেমনি ধোঁয়াশা। আমরা সবাই যেন একটা গোলকধাঁধায় আটকে গেছি যার থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় নেই।
লেখককে আবারও ধন্যবাদ আমাদের আশপাশের মানুষদের নিয়ে আমাদের ভাষায় গোলগুলো বলার জন্য। বইটা পড়ে অনেকদিন পর লিখতে বসলাম। তবে দুঃখের সাথে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম এমন চমৎকার একটা বইয়ের গুডরিডস’এ রিভিউ মাত্র তিনটা তখন বুঝলাম আমরা আসলে আমাদের সমস্যা এবং সম্ভাবনাগুলোকে আমাদের দৃষ্টি দিয়ে না দেখে উন্নত বিশ্বের দৃষ্টি দিয়ে দেখি।
যাদের কাছে শহরের ছোট পেশার মানুষেরা অপাঙতেয় তবে ব্যবসার উপকরণ। বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে আমার হাইস্কুল পড়ুয়া মেয়ে বললঃ অনেকদিন পর একটা প্রচ্ছদ দেখে মুগ্ধ হলাম। সেজন্য ধন্যবাদ পাবেন তানিয়া তাবাসসুম। পরিশেষে এমন বইয়ের বহুল পাঠ হোক সেই কামনা করছি।
এমআরএম

