বর্তমান সময়ে হঠাৎ বমি, ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এটি হতে পারে ‘স্টমাক ফ্লু’, যা অবহেলা করলে জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. সাঈদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ।
জাগো নিউজ: ‘স্টমাক ফ্লু’ বলতে আসলে কী বোঝায়? এটি কি সত্যিই ফ্লুর মতো কোনো রোগ?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: ‘স্টমাক ফ্লু’ নামটা শুনে অনেকেই ভাবেন এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর মতো কোনো শ্বাসতন্ত্রের রোগ। কিন্তু আসলে তা নয়। এটি মূলত ভাইরাসজনিত গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস, যেখানে পাকস্থলী ও অন্ত্রে সংক্রমণ হয়। অর্থাৎ এটি ফ্লু নয়, বরং পেটের একটি সংক্রমণজনিত অসুখ।
জাগো নিউজ: এই রোগের প্রধান কারণ কী?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসই দায়ী, বিশেষ করে নোরোভাইরাস বা রোটাভাইরাস। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া বা দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে। আমাদের দেশে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানির কারণেই এই রোগ বেশি দেখা যায়।
জাগো নিউজ: সাধারণত কী কী লক্ষণ দেখা যায়? কখন হাসপাতালে যেতে হবে?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: এই রোগে সাধারণত বমি, পাতলা পায়খানা (ডায়রিয়া), পেট ব্যথা, হালকা জ্বর ও দুর্বলতা দেখা যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। যেমন-
- বারবার বমি হয়ে পানি ধরে রাখতে না পারা
- তীব্র পানিশূন্যতা (মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া)
- রক্তযুক্ত পায়খানা
- অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অচেতন ভাব
জাগো নিউজ: শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। শিশুদের শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দেয়, বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই তাদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
জাগো নিউজ: মুন্সীগঞ্জ এলাকায় এই রোগের প্রকোপ কেমন? কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে বেশি হয়?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: গরম ও বর্ষা মৌসুমে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যখন পানি দূষিত হয় বা খাবার সংরক্ষণ ঠিকমতো হয় না, তখন সংক্রমণ বাড়ে। বর্তমানে মাঝেমধ্যেই এমন রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
জাগো নিউজ: ‘স্টমাক ফ্লু’ হলে ঘরে বসে কী ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরের পানিশূন্যতা রোধ করা। এজন্য বেশি করে পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি খেতে হবে। হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত এবং বিশ্রামে থাকতে হবে।
আরও পড়ুন:
- ভয় নয়, সময়মতো সার্জারি বাঁচাতে পারে জীবন
- হামের প্রকোপ বাড়ছে, সতর্ক করলেন ডা. শামীমা ইয়াসমীন
- যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতা জরুরি, অবহেলা নয়
জাগো নিউজ: ওআরএস কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এটি খাওয়ার সঠিক নিয়ম কী?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: ওআরএস বা খাবার স্যালাইন এই রোগের চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এটি শরীরের হারানো পানি ও লবণ পূরণ করে। সঠিক নিয়ম হলো, নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার পানিতে পুরো প্যাকেট মিশিয়ে নিতে হবে, অল্প অল্প করে বারবার খেতে হবে, প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর স্যালাইন খাওয়া উচিত।
জাগো নিউজ: অ্যান্টিবায়োটিক কি প্রয়োজন হয়?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। কারণ বেশিরভাগ সময় এটি ভাইরাসজনিত। তবে যদি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায় বা লক্ষণ গুরুতর হয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হতে পারে। নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়।
জাগো নিউজ: এই রোগ থেকে বাঁচতে কী কী স্বাস্থ্যবিধি মানা জরুরি?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: এই রোগ থেকে বাঁচতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু নিয়ম মানতে হবে। যে নিয়মগুলো খুবই সাধারণ, কিন্তু আমরা বেশিরভাগে সময়ই তা উপেক্ষা করি। তাই সচেতনতার সঙ্গে এসব নিয়ম মানা জরুরি। যেমন-
- খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে হাত ধোয়া
- বিশুদ্ধ পানি পান করা
- রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা
- খাবার ভালোভাবে রান্না করা
- ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া
জাগো নিউজ: অনেকেই ‘স্টমাক ফ্লু’কে হালকা রোগ মনে করেন, এটি কতটা বিপজ্জনক?
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: কোনো রোগকেই অবহেলা করা উচিত নয়। আর ‘স্টমাক ফ্লু’র ক্ষেত্রে অবহেলা করা একেবারেই উচিত নয়। কারণ এর ফলে পানিশূন্যতা দ্রুত মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
জাগো নিউজ: দারুণ সব তথ্য দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সবশেষে যদি পাঠকদের জন্য কোনো বার্তা দিতেন।
ডা. মো. সাঈদ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ। সবশেষে একটা কথাই বলবো ‘স্টমাক ফ্লু’ নামটি যতটা সাধারণ শোনায়, এর প্রভাব ততটাই গুরুতর হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ-এই তিনটিই হতে পারে নিরাপদ থাকার মূল চাবিকাঠি।
জেএস/এমএমএআর

